গোলাপি জামরুল অনেকের কাছে পছন্দের একটি ফল। এই জামরুল গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় যেমন অনিন্দ্য সুন্দর তেমনি খেতেও সুস্বাদুু। জামরুল হালকা মিষ্টি স্বাদযুক্ত একটি রসালো গ্রীষ্মকালীন ফল। বর্তমানে রঙ-বেরঙের জামরুল উৎপাদন করা হয়। সাদা, সবুজ, গোলাপী, লাল, খয়েরি, বাদামী প্রভৃতি রঙের রসালো ও হালকা মিষ্টি স্বাদের এই ফল বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই জন্মে। তবে সাদা, হালকা সবুজ ও লাল-গোলাপি রঙেরই বেশি দেখা যায়।
এর বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium samarangense. এটি Myrtaceae পরিবারের Syzygium গণের অন্তর্ভুক্ত একটি ফল গাছ। ইংরেজিতে Java Apple বা Rose Apple নামে পরিচিত। জামরুলের আঞ্চলিক নাম অনেক। যেমন—গোলাপজাম, আমরোজ, সাদাজাম, কোনো কোনো অঞ্চলে লকট নামেও পরিচিত। অঞ্চলভেদে পাইনা ফল নামেও পরিচিত। হালকা মিষ্টি অথবা পানসে স্বাদের জন্য এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। ইংরেজিতে এর অনেকগুলো নাম রয়েছে, যেমন : wax apple, love apple, java apple, royal apple, bellfruit, Jamaican apple, water apple, mountain apple, cloud apple, wax jambu, rose apple ইত্যাদি।
জামরুল ফল দেখতে ঘন্টাকৃতি। এ কারণে এটি Bell Fruit নামেও পরিচিত। জামরুল ফলের শাঁস হালকা অর্থাৎ নিরেট নয় এবং কেন্দ্রে একটি বীজ ধারণ করে।
কেউ কেউ বলেন, জামরুল খেতে পানশে। এর প্রকৃত কারণটা অবশ্য অনেকেই জানেন না। যে বছর প্রকৃতিতে প্রচন্ড রোদ পড়ে, সে বছর জামরুল হয় মিষ্টি। আর ছায়ার জামরুল খেতে পানশে। জামরুল ফলের মিষ্টতা বেশি না হলেও এই ফলটি খেতে সুস্বাদু। জামরুল সাদা, হালকা সবুজ, গোলাপী, লাল এবং কালো বর্ণেরও হয়।
সহজলভ্য জামরুল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারি। এতে খনিজ পদার্থ রয়েছে কমলার তিন গুণ এবং আম, আনারস ও তরমুজের সমান। ক্যালসিয়ামের পরিমাণ লিচু ও কুলের সমান এবং আঙুরের দ্বিগুণ। আয়রনের পরিমাণ কমলা, আঙুর, পেঁপে ও কাঁঠালের চেয়েও বেশি। ফসফরাসের পরিমাণ আপেল, আঙুর, আম ও কমলার চেয়ে বেশি।
প্রতি ১০০ গ্রাম জামরুলে থাকে:
১. জলীয় অংশ ৮৯ দশমিক ১ শতাংশ
২. ক্যারোটিন আছে ১৪১ মাইক্রোগ্রাম
৩. ভিটামিন বি-১ আছে ০.১মিলিগ্রাম
৪. ভিটামিন বি-২ আছে ০.৫ মিলিগ্রাম
৫. ভিটামিন সি ৩ মিলিগ্রাম
৭. প্রোটিন ০.৫ থেকে ০.৭ গ্রাম
৮. কার্বোহাইড্রেট ১৪.২ গ্রাম
৯. খাদ্যআঁশ ১.১ থেকে ১.৯ গ্রাম
১০. ফ্যাট ০.২ থেকে ০.৩ গ্রাম
১১. ক্যালসিয়াম ২৯ থেকে ৪৫.২ মিলিগ্রাম
১২. ম্যাগনেসিয়াম ৪ মিলিগ্রাম
১৩. ফসফরাস ১১.৭ থেকে ৩০ মিলিগ্রাম
১৪. আয়রন ০.৪৫ থেকে ১.২ মিলিগ্রাম
১৫. সোডিয়াম ৩৪.১ মিলিগ্রাম
১৬. পটাশিয়াম ৩৪.১ মিলিগ্রাম
২২. খনিজ পদার্থ ০.৩ গ্রাম
২৩. খাদ্যশক্তি রয়েছে ৩৯ কিলোক্যালারি
১. হজম শক্তি বৃদ্ধিতে:
জামরুলের উচ্চমাত্রার ফাইবার হজমে দারুণ উপকারি। কোষ্ঠকাঠিন্য বলতে কোনো সমস্যাই থাকে না। এর বিচি ডায়রিয়া প্রতিরোধে অনেকটা ওষুধের মতো কাজ করে।
২. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে:
জাম্বোসাইন একধরনের ক্ষারজাতীয় উপাদান। এটি স্টার্চকে চিনিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সুস্থ মানুষের দেহে ডায়াবেটিস বাসা বাঁধা ঠেকিয়ে দিতে দক্ষ জামরুল। কাজেই জামরুল খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে যাবে না।
জামরুলে রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধের উপাদান। তাই নিয়মিত জামরুল খেলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।
৪. কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে:
ফাইবার ও পুষ্টি উপাদানের সম্মিলত উপস্থিতি দেহের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে দারুণ কার্যকরি। অ্যাথেরোসক্লেরোসিসের ঝুঁকিও কমে আসে উল্লেখযোগ্য হারে। কার্ডিওভাসকুলার বিষয়ক জটিলতা হ্রাস পায়। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক আর করোনারি রোগের ঝুঁকিও আপনাকে পেরেশানিতে রাখবে না।
৫. মস্তিষ্ক ও লিভারের জন্য:
মস্তিষ্ক ও লিভারের সুরক্ষায় জামরুল টনিক হিসাবে কাজ করে।
জামরুল ভেষজগুণ সমৃদ্ধ ফল। বাত নিরাময়ে এটি ব্যবহার করা হয়।
৭. চোখের কালি দূর করতে:
অঘুম কিংবা দুশ্চিন্তায় যাদের চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে তারা সেই কালি দূর করতে নিয়মিত একটি করে জামরুল খেয়ে দেখতে পারেন।
৮. রোগ প্রতিরোধ:
জামরুলের কার্যকরী ও শক্তিশালী উপাদানগুলো জীবাণু এবং ছত্রাকনাশক হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকে ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকায় এই ফল। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
৯. বিষাক্ত উপাদান পরিষ্কারে:
প্রতিনিয়ত শরীরে বিষাক্ত উপাদান ঘুরে বেড়ায়। শত শত বছর ধরে দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ ধুয়ে বের করে দিতে জামরুলের কদর রয়েছে। লিভার আর কিডনির বিষ দূর করে বিপাকক্রিয়া সুষ্ঠু রাখতে যেন এক অব্যর্থ টোটকা এই জামরুল।
Related