নারিকেল Coconut একটি সুস্বাদু ফল। কাঁচা অবস্থায় একে ডাব বলা হয় যার পানি অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর। পাকার পর এটাকে ঝুনা নারিকেল বলা হয়। নারিকেল বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল।
নারিকেল এমন এক বৃক্ষ যার প্রতিটি অঙ্গ জনজীবনে কোনো না কোনোভাবে কাজে আসে। এ গাছের পাতা, ফুল, ফল, কাণ্ড, শিকড় সব কিছুই বিভিন্ন ছোট-বড় শিল্পের কাঁচা মাল, হরেকরকম মুখরোচক নানা পদের সুস্বাদু খাবার তৈরির উপকরণ, পুষ্টিতে সমৃদ্ধ, সুস্বাদু পানীয়, রোগীর পথ্য এসব গুণে গুণাম্বিত এটি পৃথিবীর অপূর্ব গাছ। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নারিকেল খাওয়ার প্রচলন আছে। বাংলাদেশের সর্বত্রই নারিকেল গাছ জন্মায়। তবে উপকূলীয় জেলাসমূহে উৎপাদন বেশি হয়।
সুপরিচিত নারিকেল Palmae গোত্রের শাখা-প্রশাখাবিহীন লম্বা একবীজপত্রী বৃক্ষের Cocos nucifera ফল। নারিকেল গাছ বিশ্বের উষ্ণমন্ডলে বিস্তৃত; বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলে নিচু জমি ও ক্ষুদ্র দ্বীপাঞ্চলে এ গাছ ভাল জন্মে। শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া এবং ভারতে এ গাছ প্রচুর জন্মে।
গাছের উচ্চতা হয় ২০-৩০ মিটার, কান্ড মসৃণ ও বেলনাকার, উপরের দিকে ক্রমশ সরু। বাংলাদেশের সর্বত্রই নারিকেল গাছ জন্মে। তবে সমুদ্রতীরবর্তী লোনা মাটিতে এর উৎপাদন ভাল। বাংলাদেশে যেসব নারিকেলের চাষ করা হয় সেগুলি হচ্ছে টিপিকা সবুজ, টিপিকা বাদামি ও দুধে। জাতভেদে বছরে প্রতি গাছে ২০০ বা ততোধিক নারিকেল পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক দিক থেকে নারিকেল গুরুত্বপূর্ণ ফল। বাংলাদেশে নারিকেল চাষের জমি এবং উৎপন্ন নারিকেলের পরিমাণ যথাক্রমে প্রায় ৫,১৯২ হেক্টর ও ২,৭১,১৩৫ মে টন।
পুষ্টিমান ও গুণাগুণ :
ডাব ও নারিকেলের সব অংশই আহার উপযোগী, শাঁস Copra বা Carnel অতি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। এতে প্রচুর পরিমাণ চর্বি, আমিষ, শর্করা, ক্যালসিয়াম, ভিটামিনস ও খনিজ লবণে ভরপুর। এতগুলো খাদ্য উপাদান একত্রে কোনো ফলে প্রাপ্তি একটা বিরল দৃষ্টান্ত। কিছু অসুখে ডাবের পানি রোগীদের অন্যতম পথ্য। এর মধ্যে ডায়রিয়া, কলেরা, জন্ডিস, পাতলা দাস্ত, পানিশূন্যতা পূরণে ডাবের পানির অবদান অন্যন্য। ঘন ঘন বমি ও পাতলা পায়খানার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে পড়লে এ সময় স্যালাইনের বিকল্প হিসেবে ডাক্তার, কবিরাজরা ডাবের পানি পান অব্যাহত রাখতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
নারিকেলের শক্ত শাঁস দুধের মতো সাদা এবং বেশ সুস্বাদু। এর শাঁস বিভিন্ন প্রকার পিঠা তৈরিতে, মিষ্টি, বিস্কুট, চকোলেট ও বিবিধ রান্নায় ব্যবহার্য। শুকনো নারিকেলের শাঁস থেকে তৈরি উদ্ভিজ্জ তৈল মাথায় ব্যবহার ছাড়াও রান্নায়, সাবান, শ্যাম্পু এবং অন্যান্য প্রসাধন সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহূত হয়। তেল নিষ্কাশনের পর পরিত্যক্ত খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহূত হয়। নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে শক্ত দড়ি, ব্রাশ, জাজিম, পাপোশ তৈরি করা যায়। নারিকেলের খোল দিয়ে তৈরি হয় হুঁকো। কাঁচা ও শুকনো পাতা দিয়ে মাদুর ও ঝুড়ি তৈরি এবং কুঁড়েঘর ছাওয়া যায়। পাতার মধ্যশিরা দিয়ে ঝাঁটা তৈরি করা যায়। কচি নারিকেলকে ডাব বলা হয়; ডাবের পানি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। ডাব কোষকলাচাষের (tissue culture) অন্যতম মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহূত হয়। গাছের কান্ড দিয়ে ঘরের আড়া, পুলের খাম্বা, ঘরের খুঁটি ও বর্শার হাতল তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে ফল ও অন্যান্য কাজের জন্য বসতবাড়ির গাছ হিসেবে ব্যাপকভাবে এ গাছ লাগানো হয়।
