বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় একটি মসলা হলো দারুচিনি। এর ঘ্রাণ, স্বাদ এবং ঔষধি গুণের জন্য এটি প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে। এই গাছটি শুধু রান্নার উপকরণ হিসেবেই নয়, ওষুধ, প্রসাধনী এবং পরিবেশগত উপকারিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ সুগন্ধ ও মিষ্টি স্বাদযুক্ত দারুচিনি যে কোন মাংস রান্নায় অপরিহার্য।
Lauraceae পরিবারের দারুচিনির ইংরেজি নাম Cinnamon, আর বৈজ্ঞানিক নাম Cinnamomum zeylanicum. চির সবুজ মাঝারি আকারের ঝোপালো শাখাযুক্ত এ গাছ ১০ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। দারুচিনির আদি নিবাস শ্রীলংকা।
দারুচিনির বাকলে থাকে ‘সিনামালডিহাইড’ যা এর সুঘ্রাণ সৃষ্টি করে। আর পাতায় থাকে ‘ইউজিনল’। তাছাড়া এতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মিনারেল ও ভিটামিন। দারুচিনি গাছের প্রায় প্রতিটি অঙ্গ যেমন- বাকল, পাতা, কুঁড়ি, ফুল, ফল ও শেকড় কোন না কোন কাজে লাগে।
দারুচিনির ভেজষগুণ
দারুচিনির বাকল উত্তেজক, ক্ষুধাবর্ধক, গা বমি করা, পেটের অসুখ, হার্টের দুর্বলতা, অর্শ, আমবাত, কফ, বায়ু ও বমি উপশম করতে সাহায্য করে।
দারুচিনি ব্যবহার
দারুচিনি বিভিন্ন খাবারের মসলা ছাড়াও মিষ্টি ও মদ সুগন্ধি করতে, ওষুধ শিল্পে, সাবান ও দাঁতের মাজন তৈরিতে, চকলেট কারখানাতে এটা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পাতার তেল, সুগন্ধি তৈরি করতে এবং কৃত্রিম ভ্যানিলা তৈরিতে ব্যবহার হয়ে থাকে।
দারুচিনি চাষে জাত
সারা বিশ্বে দারুচিনির বেশ কয়েকটি জাত চাষ হয়ে থাকে। এদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে যথা- সিনোল বা প্রকৃত দারুচিনি এবং জংলী বা ঝুটা দারুচিনি। প্রকৃত দারুচিনি বাদমি রঙের, অধিক সুঘ্রাণযুক্ত, পাতলা, মসৃণ, বেশি সুস্বাদু ও মিষ্টি। শ্রীলংকায় প্রকৃত দারুচিনির উৎপাদন বেশি হয়। আর জংলী দারুচিনির মধ্যে চীনা, সায়গন, ইন্দোনেশিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান, ভারতীয় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক সারাদেশে চাষযোগ্য দারুচিনির একটি জাত অবমুক্ত করা হয়েছে, যা বারি দারুচিনি-১ নামে পরিচিত। এ জাতটির বাকলে অতি মাত্রায় সুঘ্রাণযুক্ত উদ্বায়ী তেল রয়েছে এবং জিংক সমৃদ্ধ। খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল। আর হেক্টর প্রতি ৩৮৫ কেজি বাকল পাওয়া যেতে পারে।
দারুচিনি চাষে প্রয়োজনীয় জলবায়ু ও মাটি:
১। দারুচিনি চাষের জন্য উত্তম নিকাশযুক্ত বেলে দোঁআশ মাটি উত্তম। দারুচিনি গাছ একটানা খরা সহ্য করতে পারে না।
২। দারুচিনি গাছ আর্দ্র ও শুষ্ক আবহাওয়ায় ভাল হয়। বেলে দোআঁশ মাটিতে দারুচিনি চাষ করলে গাছের বাকলের গুণগত মান ভাল হয়।
৩। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৫০ মিটার পর্যন্ত উঁচু জমিতে দারুচিনি চাষ করা যায়।
দারুচিনি চাষে চারা তৈরি
১। দারুচিনির চারা সাধারণতঃ বীজ থেকে হয়ে থাকে, তবে কাটিং বা গুটিকলম করেও চারা করা যায়।
২। দারুচিনি গাছে জানুয়ারী মাসে ফুল আসে এবং জুলাই-আগস্ট মাসে ফল পাকতে শুরু করে। গাছ থেকে বীজ সংগ্রহের পর যত তাড়াতাড়ি পারা যায় মাটিতে তা বুনতে হবে।
৩। দারুচিনির বীজ উঁচু বীজতলায় রোপন করতে হবে। এরপর যখন চারা তৈরি হবে তখন তা স্থানান্তর করতে হবে।
দারুচিনি চাষে জমি তৈরি ও চারা রোপণ
১। দারুচিনি চাষের জমি ভাল করে কয়েকটি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে।
২। দারুচিনির চারা যখন পাতার রং সবুজ হবে তখন সেসব চারা নিয়ে মাটিতে লাগাতে হবে। মনে রাখবেন কচি চারার রং থাকে লালচে।
৩। দারুচিনির চাষ করার ক্ষেত্রে বর্ষার ক্ষেত্রে চারা রোপণ করতে হবে। এবং চারা লাগানোর সময় সারি করে চারা লাগাতে হবে। প্রতিটি সারির দূরত্ব হবে ২ মিটার।
দারুচিনি চাষে সার প্রয়োগ/ব্যবস্থাপনা
১। দারুচিনি চাষ করার ক্ষেত্রে ১ম বছর ৫০ গ্রাম টিএসপি, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ও ৭৫ গ্রাম এমওপি সার দিতে হবে।
২। প্রতি বছর দারুচিনি গাছের গোড়ায় ১৫ থেকে ২০ কেজি গোবর দিতে হবে। সার প্রয়োগের শেষ দিকে ৪০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৪৫০ গ্রাম টিএসপি এবং ৫০০ গ্রাম এমওপি সার দিতে হবে।
দারুচিনি চাষে রোগ বালাই ব্যবস্থাপনা
দারুচিনি গাছে বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন রোগবালাই হয়ে থাকে।
এর মধ্যে-
দারুচিনি চাষে ছত্রাকজনিত রোগ
(১) গোলাপী রোগ, (২) চারা ধ্বসা, (৩) মরচে ধরা রোগ, (৪) পাতায় দাগ, (৫) ধূসর ধ্বসা
এসকল রোগ দেখা দিলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
দারুচিনি চাষে পোকা-মাকড়
(১) পাতার ত্বক ভেদকারী পোকা, (২) প্রজাপতি, (৩) পাতা খেকো লেদা পোকা, (৪) লাল পিঁপড়া
এ পোকা গুলো দারুচিনি গাছের বিভিন্ন প্রকার ক্ষতি করে থাকে। এই সব পোকা দেখা দেওয়া মাত্র প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে।
দারুচিনি গাছের পরিচর্যা
১। দারুচিনি ক্ষেতে সবসময় সঠিক নিয়মে পানি সেচ দিতে হবে। এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন গাছের গোড়ায় পানি না জমে। পানি জমলে অবশ্যই তা অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে।
২। গাছের গোড়ায় যেন কোন আগাছা না জন্মে সেদিকে খেয়াল রাখত হবে। যদি আগাছা জন্মে তাহলে তা পরিষ্কার করে দিতে হবে।
৩। কাণ্ডের গোঁড়া থেকে পাশে কোন ডাল গজালে সেগুলো ছেঁটে দিতে হবে। এবং নিয়মিতে গাছের ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে।এতে পরে গাছের বৃদ্ধি ভাল হবে ও গাছ ঝোপালো হবে।
ফসল তোলা ও ফলন
দারুচিনি গাছ ১০-১৫ মিটার লম্বা হতে পারে,তবে ডাল ছাটাই করে এটার আকার নিয়ন্ত্রেণে রাখা যায়। পাঁচ বছর বয়সী গাছ হতে নিয়মিত ছাল ছাড়াবার ডাল পাওয়া সম্ভব। একাধিকবার ডাল কাটা যায়, তবে সবচে ভাল একবার ডাল কাটা এবং সেটা কাটতে হয় এপ্রিল মে মাসে।
সাধারনতঃ ১-৩ সেমি ব্যাসের এবং এক হতে দেড় মিটার লম্বা ডাল কাটা ভাল। এ ধরনের ডাল হতে ভালমানের ছাল পাওয়া সম্ভব। পরিণত গাছ হতে বছরে প্রতি হেক্টর জমির গাছ হতে ২০০-৩০০ কেজি শুকনা ছাল পাওয়া সম্ভব। শুকনা পাতা ও ছাল হতে তেল নিষ্কাশন করা যায়,যে তেল বাণ্যিজ্যিকভাবে সুগন্ধি এবং ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
