ফলসা আমাদের কাছে বুনো অপ্রচলিত ফল হিসেবেই পরিচিত। গ্রামে একসময় প্রচুর পরিমাণে দেখা গেলেও ইদানীং বেশ দুর্লভ হয়ে উঠেছে গাছটি। ফলসা গাছ হিসেবেও অনন্য। বড় বড় পাতার এই গাছ ডালপালা ছড়িয়ে ছাতার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সারা বছর তামাটে রঙের নতুন নতুন পাতা এগাছের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এটি প্রধানত দক্ষিণ এশিয়ার ফল। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান থেকে কম্বোডিয়া পর্যন্ত এর দেখা মেলে। ফলসা ফলের আঞ্চলিক নামঃ পেলা গোটা, টকরোই। ইংরেজি নাম Phalsa, Sherbet Berry, Gromia. ফলসার বৈজ্ঞানিক নাম- Grewia asiatica. Tiliaceae পরিবারভুক্ত Grewia subinaequalis গণের উদ্ভিদ।
ফলসা মাঝারি আকৃতির পাতাঝরা গাছ। এগাছ সাধারণত ৫ থেকে ৭ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। পাতা খসখসে, রোমশ ও কিনারা দাঁতানো। হালকা হলদে রঙের ক্ষুদ্রাকৃতির ফুল ফোটে মার্চ-এপ্রিলে। আর ফল পাকতে শুরু করে মে-জুন মাসের দিকে। ফল দেখতে অনেকটা মটর দানার মতো, গোলাকার। ফলের কাঁচা রং সবুজ, তখন স্বাদে টক। পাকা ফলের রং কালচে বাদামি, তখন স্বাদ টক-মিষ্টি ধরনের।
এই ফলের রস গরমে ক্লান্তিনাশক। তাছাড়া স্কোয়াশ ও অন্য কোমল পানীয় তৈরিতেও কাজে লাগে। প্রতি ১০০০ গ্রাম ফল থেকে ৭২৪ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। মায়ানমারে এ গাছের বাকল সাবানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া বাকলের আঠাল উপাদান খাদ্যদ্রব্য শোধনেও কাজে লাগে।রক্ত শুন্যতায় ফলসা উপকারি।
ফলসা অনেকেই চেনেন না। কিংবা কুলীন ফল নয় ভেবে এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু গাছটি একেবারেই আমাদের নিজস্ব। ভারত উপমহাদেশ তার আদি আবাস। অথচ এখন আমাদের চারপাশ থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। নগর প্রকৃতিতে এই প্রবণতা আরও প্রকট। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় এখনও অল্পসল্প চোখে পড়ে।
ফলসায় রয়েছে আরও অনেক খাদ্যগুণ। বাতের ব্যথার সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই ফলসা খেয়ে থাকেন। এই ফলে থাকে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ, যা বাতের ব্যথার কারণে পায়ের গিঁট ফুলে যাওয়া ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। এই ফলে আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস। এই উপাদানটি আমাদের শরীরে অ্যান্টি ক্যান্সার এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। ফলের রসে থাকে লো-গ্লাইসেমিক ইনডেক্স। এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ফলসায় থাকা ফাইটোকেমিক্যালস উপাদান শ্বাস সম্বন্ধীয় সমস্যার উপশম ঘটায়। এই ফলে থাকা পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম আমাদের হাড় মজবুত রাখতে সাহায্য করে। ফলে পর্যাপ্ত মাত্রায় ফাইবার থাকে, যা আমাদের পেটে ব্যথা হলে দ্রুত উপশমে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়ারিয়া প্রতিরোধে ফলসা ফল ও গাছের বাকল অত্যন্ত কার্যকর।
ফলসার পাকা ফল রস করেও খাওয়া যায়। স্বাদ বাড়ানোর জন্য তাতে সামান্য লেবুর রস এবং পুদিনা পাতাও যোগ করা যায়। শরবতের সঙ্গে সামান্য পরিমাণে গোলাপ ফুলের পাপড়িও মেশানো যেতে পারে। আবার স্বাদের ভিন্নতার জন্য ফ্রুট স্যালাডে মিশিয়েও ফলসা খাওয়া যায়। এছাড়া আইসক্রিম, মিষ্টি পাউরুটি কিংবা অন্য কিছু বানানোর জন্য মিষ্টি সিরাপ তৈরি করতেও ফলসা ফল ব্যবহার করা যায়। তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবসময়ই পরিমিতি থাকতে হবে।
