অশোক মাঝারি আকৃতির ছায়াসুনিবিড় চিরহরিৎ বৃক্ষ। গাঢ়-সবুজ পত্রিকাগুলো দীর্ঘ, চওড়া ও বর্শাফলাকৃতির। কচিপাতা কোমল, নমনীয়, ঝুলন্ত এবং তামাটে। কমলা আর লালে মেশানো ফুলগুলো ঝলমল করে বসন্ত এলেই। হেমন্ত অবধি ফুল ফোটে। শীতকালেও ফোটে, তবে সংখ্যায় কম। অশোক গাছটি সাধারণত ফুলের জন্য বিখ্যাত। ফুলগুলো সুগন্ধিযুক্ত, বিশেষ করে রাতে তীব্র সুবাস ছড়ায়।
ফুলপ্রেমিদের অবাক করে গাছের কাণ্ড ফুঁড়ে বেরিয়ে পড়ে থোকা থোকা ফুল। ফুল ছোট, কিন্তু বহুপৌষ্পিক, ছত্রাকৃতি মঞ্জরি আকারে বড়। অজস্র ফুলে ঘনবদ্ধ অশোকমঞ্জরি বর্ণ ও গড়নে আকর্ষণীয়। তাজা ফুলের রং কমলা, কিন্তু বাসি ফুল লাল। পরাগকেশর দীর্ঘ। মূলত ফুলের জন্যই গাছটি বিখ্যাত কারণ, বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই ফুল কিছুটা আলাদা। কমসংখ্যক উদ্ভিদ প্রজাতির ক্ষেত্রেই কাণ্ড থেকে ডালপালাজুড়ে ফুল ফোটে। সবুজ পাতার ফাঁকে কমলা ও লালরঙের ফুলেরা যেন উঁকি মারছে। তবে যাদের চোখ পড়ে এই অশোক ফুলে, তারা নিসন্দেহে মুগ্ধ হয়ে বারবার তাকায়।
এই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Saraca asoca অশোক গাছের বৈজ্ঞানিক নাম সারাকা ইনডিকা। এটির ইংরেজি নাম ইয়েলো অশোক। অনেকেই স্থানীয়ভাবে অশোকষষ্ঠী ও অশোকাষ্টমী অশোকফুল অশোককানন নাম চিনে থাকে। গাছটি সেসালপিনিয়াসি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত Fabaceae পরিবারের এক প্রজাতির বৃক্ষ। আমাদের এই দেশি বৃক্ষটির খ্যাতি সুপ্রাচীন। গাছটি এই অঞ্চলের নিজস্ব বৃক্ষ।
সাধারণত ৬-৯ মিটার (২০-৩০ ফুট) পর্যন্ত উঁচু হতে পারে, তবে কিছু ক্ষেত্রে ২০ মিটার (৬৬ ফুট) পর্যন্তও দেখা যায়। গাছটির সরল কাণ্ড এবং বিস্তৃত, ঘন পাতাযুক্ত ডালপালা থাকে যা একটি ছাতা আকৃতির রূপ নেয়। এটির বাকল গাঢ় বাদামী থেকে প্রায় কালো রঙের, অসমান এবং আঁচিলযুক্ত হতে পারে। পাতাগুলো যৌগিক, প্রতিটি পাতায় ৬-১২টি ছোট, লম্বাটে এবং গাঢ় সবুজ রঙের পাতা থাকে। নতুন পাতা তামাটে বা লালচে রঙের হয় এবং ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে।
শোক বা দুঃখ নাশ করে বলেই এর নাম অশোক যা শান্তি ও আনন্দের প্রতীক। রোগ নিরাময়ে ভেষজ গুণ, শীতল ছায়া, মধুরিমা সুবাস এবং পুষ্প-প্রাচুর্য ইত্যাদির জন্যই এমন নাম। অশোক গাছের বিভিন্ন অংশ, যেমন- বাকল, ফুল, পাতা এবং বীজ ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় আয়ুর্বেদ, ইউনানি চিকিৎসাপদ্ধতিতে বহু রোগের নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। উল্লেখযোগ্য ঔষধি ব্যবহার হলো- অশোক গাছের বাকলে ব্যথানাশক ও প্রদাহনাশক উপাদান রয়েছে। তাছাড়াও কিছু গবেষণায় এর জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্যও পাওয়া গেছে। অশোক ফুলের নির্যাস ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
বাকলের নির্যাস ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা, যেমন- ব্রণ ও অন্যান্য দাগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। হজমক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং পেটের সমস্যায় উপকার দেয়। এর বাকলে ট্যানিন, ক্যাটেকোহল, স্টেরল এবং বিবিধ ধরনের ক্যালসিয়াম যৌগ পাওয়া যায়। বিবিধ স্ত্রীরোগ, রক্তক্ষরণ এবং আমাশয়ে এর ছালের রস কার্যকর। শুকনো ফুল রক্ত আমাশয়ে এবং বীজ মূত্রনালির রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কাঠ নরম ও মূল্যহীন।
ফুলের মঞ্জরি পিঁপড়ের প্রিয় আবাস। ফল বড়সড় শিমের মতো, চ্যাপ্টা, চার্ম এবং ঈষৎ বেগুনি। বীজ থেকে সহজে চারা জন্মালেও বৃদ্ধি মন্থর।
